শক্তিপুজো করতে গেলেই নিতে হয় অনুমতি! ৫০০০ বছরের প্রাচীন শক্তিপীঠ তমলুকের মা বর্গভীমার মন্দিরে ধুমধাম করে কালীপুজো
**তমলুক:** শহরে শক্তিপুজোর আয়োজন করতে গেলেই নিতে হয় অনুমতি! তবে সেই অনুমতি কোনও প্রশাসনিক দফতর থেকে নয়, নিতে হয় স্বয়ং দেবী মা বর্গভীমার কাছ থেকে! এমনই এক প্রাচীন ঐতিহ্য ও বিশ্বাসকে ঘিরে আজও চলে আসছে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক শহরের শক্তিপীঠ মা বর্গভীমার আরাধনা। কথিত আছে, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন এই শক্তিপীঠে কালীপুজোর দিন রাজবেশে সাজানো হয় দেবীকে। আয়োজন করা হয় বিশেষ পুজো ও মহাভোগের। দেবী দর্শনে ভিড় জমান অসংখ্য ভক্ত।
তমলুক শহরের আরাধ্য দেবী মা বর্গভীমা। শহরের বাসিন্দাদের কাছে যে কোনও শুভ কাজ কিংবা পুজোর আগে মা বর্গভীমার আশীর্বাদ নেওয়া এক দীর্ঘদিনের প্রথা। কয়েক হাজার বছর ধরে আদ্যাশক্তি মহামায়ার রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন দেবী বর্গভীমা। মতান্তরে তিনি ভীমরূপা বা ভৈরব কপালী নামেও পরিচিত।
পুরাণ অনুসারে, দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ খণ্ডিত হয়ে যায়। কথিত আছে, সতীর বাম পায়ের গোড়ালি এসে পড়েছিল এই তমলুকেই। সেই থেকেই একান্ন পীঠের অন্যতম শক্তিপীঠ হিসেবে এখানে দেবী বর্গভীমার আরাধনা হয়ে আসছে। যদিও প্রাচীন এই মন্দিরের প্রকৃত বয়স নির্ধারণ করা বেশ কঠিন।
মহাভারতের কাহিনি এবং স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ময়ূর বংশীয় রাজা তাম্রধ্বজ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, এক দরিদ্র ধীবরপত্নী প্রতিদিন রাজপরিবারে জ্যান্ত শোল মাছ সরবরাহ করতেন। কীভাবে সারা বছর জ্যান্ত মাছের জোগান দিচ্ছেন তিনি, তা জানতে চান রাজা। তখন ধীবরপত্নী জানান, জঙ্গলের মধ্যে থাকা একটি কূপের জল ছিটিয়ে মৃত শোল মাছকে জীবিত করে তোলা যায়। সেই রহস্য জানতে গিয়ে রাজা সেখানে উগ্রতারা রূপে দেবী বর্গভীমার মূর্তি দেখতে পান। এরপরই ওই স্থানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে আরও এক বিশেষ ঐতিহ্য। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অতীতে তমলুক এলাকায় দেবী বর্গভীমা ছাড়া অন্য কোনও শক্তিপুজোর প্রচলন ছিল না। পরবর্তীকালে জেলায় শক্তিপুজোর প্রসার ঘটলেও নতুন করে শক্তিপুজো শুরু করার আগে আজও মা বর্গভীমার কাছে অনুমতি ও আশীর্বাদ নেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে।
কালীপুজোর দিন মন্দিরে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজবেশে সাজানো হয় দেবীকে। নানা ব্যঞ্জন সহযোগে অন্নভোগ নিবেদন করা হয় মাকে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে প্রতিদিনই দেবীকে শোল মাছের ঝোল নিবেদন করা হয়। ভক্তরাও মিষ্টির পাশাপাশি মানত পূরণের আশায় তাল, ওল, কচু এবং শোল মাছ নিয়ে মন্দিরে হাজির হন।
ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও বিশেষ পরিচিতি রয়েছে এই মন্দিরের। শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই নন, ভিন্ন ধর্মের মানুষজনও দেবী বর্গভীমার মন্দিরে আসেন পুজো দিতে ও প্রার্থনা জানাতে।
ইতিহাস, পুরাণ, লোককথা এবং কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যকে বুকে নিয়ে আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তমলুকের মা বর্গভীমার মন্দির। কালীপুজোকে কেন্দ্র করে সেই প্রাচীন শক্তিপীঠে ভক্তদের ভিড় যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, সময় বদলালেও মানুষের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত।