২৯ জুলাই ২০২৬
বাংলার খবর, বিশ্বের নজরে
তাজা খবর
নীল ব্রালেট লুকে ভাইরাল ত্রিধা চৌধুরী, মুগ্ধ অনুরাগীরা হাওড়ায় চলন্ত বাসে তাণ্ডব, যাত্রীদের প্রতিরোধে ধরা দুষ্কৃতী রাজ্য পুলিশে ১ লক্ষ নিয়োগের ঘোষণা, রেশন ভাতা বৃদ্ধি, ভবানী ভবন থেকে একগুচ্ছ বড় সিদ্ধান্ত বৃষ্টিতে ভেস্তে যাচ্ছে সমুদ্র-ছুটি, হোটেলবন্দি দিঘার পর্যটকেরা, কবে কাটবে অপেক্ষা? মেদিনীপুরে বুলডোজার অভিযান, ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা তৃণমূল পার্টি অফিস ভাঙল প্রশাসন
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

AI কি সত্যিই আপনার চাকরি খেয়ে নেবে? আতঙ্কের পাশে বাস্তবটা ঠিক কী

লিখেছেন Bengal News Net ৪৮ বার পঠিত ৫ মিনিটের পড়া
AI কি সত্যিই আপনার চাকরি খেয়ে নেবে? আতঙ্কের পাশে বাস্তবটা ঠিক কী

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কি সাধারণ মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে— এই প্রশ্ন এখন অফিস থেকে চায়ের দোকান, সর্বত্র। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের একাধিক আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় সমীক্ষা বলছে, ছবিটা যতটা আতঙ্কের, ততটাই জটিল— AI কিছু ধরনের কাজ কমিয়ে দিচ্ছে ঠিকই, আবার একই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজও তৈরি করছে, আর সবচেয়ে বড় প্রভাবটা পড়ছে কাজের ধরন বদলে দেওয়ায়, চাকরি একেবারে মুছে দেওয়ায় নয়।


বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (World Economic Forum) ‘ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফলে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কাজ তৈরি হবে, আর প্রায় ৯ কোটি ২০ লক্ষ কাজ বিলুপ্ত হবে। অর্থাৎ হিসেব কষলে নিট বৃদ্ধি প্রায় ৭ কোটি ৮০ লক্ষ কাজের। রিপোর্টটি ৫৫টি দেশের ১,০০০-এর বেশি নিয়োগকর্তার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

তবে এই সংখ্যাগুলোর নিচেই লুকিয়ে আছে আসল বদল। ফোরামের রিপোর্ট বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ কাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে AI ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, বিগ ডেটা বিশ্লেষক, সাইবার নিরাপত্তা ও সফটওয়্যার ডেভেলপারের মতো কাজ। উল্টো দিকে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খাবে কেরানি ও দপ্তরের রুটিন কাজ— যেমন ডেটা এন্ট্রি কর্মী, ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার, ডাকঘরের কর্মী।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ কোনও-না-কোনওভাবে AI-এর প্রভাবের আওতায় পড়বে। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, উন্নত অর্থনীতিতে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তা তুলনায় কম— ভারতের মতো উদীয়মান বাজারে প্রায় ৪০ শতাংশ, আর নিম্ন-আয়ের দেশে প্রায় ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ ধাক্কাটা সব দেশে সমান নয়।

ভারতের ক্ষেত্রে ছবিটা কী? সবচেয়ে বিস্তারিত সমীক্ষাটি করেছে ICRIER (Indian Council for Research on International Economic Relations), যাতে সহযোগিতা করেছে OpenAI। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১০টি শহরের ৬৫০টি IT সংস্থার উপর চালানো এই সমীক্ষার সিদ্ধান্ত— জেনারেটিভ AI ভারতের IT ক্ষেত্রে গণছাঁটাই ডেকে আনছে না। বরং কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে।

কিন্তু ছাঁটাই একেবারে হচ্ছে না, তা-ও নয়। স্টাফিং সংস্থা টিমলিজ (TeamLease)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ভারতের প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার কর্মী ‘নীরব ছাঁটাই’-এর (silent layoffs) মধ্যে দিয়ে চাকরি হারিয়েছেন— অর্থাৎ প্রকাশ্য ঘোষণা ছাড়াই কর্মী কমানো হয়েছে। আরেকটি সংস্থা CIEL HR Services-এর হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। শিল্পমহলের একাংশের অনুমান, গোটা ২০২৬ সালে ভারতের প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার পর্যন্ত পদ কমতে পারে। তবে এই ছাঁটাই কেবল AI-এর জন্য নয়, বরং কোভিড-পরবর্তী অতিরিক্ত নিয়োগের সংশোধন এবং সংস্থার কাঠামো পুনর্গঠনও এর বড় কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১,০০৬ জন বিশ্বব্যাপী কর্তার উপর চালানো সমীক্ষার ভিত্তিতে জানুয়ারি ২০২৬-এর ওই রিপোর্ট বলছে, মাত্র ২ শতাংশ সংস্থা প্রকৃত AI প্রয়োগের কারণে বড় ছাঁটাই করার কথা জানিয়েছে। বাকিরা কর্মী কমাচ্ছে বা নিয়োগ ধীর করছে মূলত ভবিষ্যতে AI কাজের চাহিদা বদলে দেবে— এই আশঙ্কায়। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে ছাঁটাইটা এখনই AI-এর ফল নয়, বরং AI আসবে ধরে নিয়ে আগাম প্রস্তুতি।

উল্টো দিকে চাহিদাও বাড়ছে। জব-পোর্টাল foundit-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে AI-সংক্রান্ত নিয়োগ ২০২৬ সালে বছরে প্রায় ৩২ শতাংশ হারে বাড়তে পারে, পৌঁছে যেতে পারে প্রায় ৩.৮ লক্ষ পদে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ IT ও সফটওয়্যার (৩৭ শতাংশ), তারপরে ব্যাঙ্কিং-বিমা (প্রায় ১৬ শতাংশ)।

পরামর্শদাতা সংস্থা PwC-র ‘গ্লোবাল AI জবস ব্যারোমিটার ২০২৬’ আরেকটি দিক তুলে ধরেছে। এক বিলিয়নেরও বেশি চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে সংস্থাটির দাবি, যেসব সংস্থা সবচেয়ে বেশি AI ব্যবহার করছে, তাদের উৎপাদনশীলতা যারা কম ব্যবহার করছে তাদের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি— এবং এই সংস্থাগুলি বেতন ও কর্মী সংখ্যাও দ্রুত বাড়াচ্ছে। তবে একই সঙ্গে AI-নির্ভর কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতা কম-AI কাজের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।


AI চাকরি খেয়ে নেবে কি না— এই বিতর্ক নতুন নয়। প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সময়ই একই আশঙ্কা উঠেছে, কম্পিউটার আসার সময় থেকে অটোমেশন পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ বলছেন, AI-এর প্রভাব দুই ভাগে ভাগ করে দেখা দরকার— কোন ‘চাকরি’ পুরোপুরি মুছে যাচ্ছে, আর কোন ‘কাজ’ (task) AI করে দিচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গোটা চাকরি নয়, চাকরির ভিতরের কিছু রুটিন কাজ AI নিয়ে নিচ্ছে, ফলে কাজের ধরন বদলাচ্ছে।

ভারতের প্রেক্ষিতে আরেকটি জরুরি প্রসঙ্গ— অসংগঠিত ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ‘গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রেন্ডস ২০২৬’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কর্মী অসংগঠিত বা আধা-সংগঠিত কাজে যুক্ত, যেখানে অধিকাংশের লিখিত চুক্তি, সবেতন ছুটি বা সামাজিক সুরক্ষা নেই। এই বিপুল অংশের উপর AI-এর সরাসরি প্রভাব IT বা হোয়াইট-কলার কাজের মতো তীব্র নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে অটোমেশন ও রোবোটিক্সের ছোঁয়া ব্লু-কলার কাজেও পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

প্রায় সব রিপোর্টেই একটি সাধারণ পরামর্শ উঠে এসেছে— দক্ষতা বাড়ানো বা ‘আপস্কিলিং’। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসেবে, ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমান দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ বদলে যাবে বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। ফলে যাঁরা AI-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছেন, তাঁদের সুযোগ বাড়ছে; আর যাঁরা কেবল রুটিন কাজে আটকে, তাঁদের চাপ বাড়ছে।


AI, artificial intelligence, চাকরি, AI jobs, future of work, প্রযুক্তি, IT sector India, automation

সম্পর্কিত খবর